একলব্যের_সন্ন্যাসযোগ
সুব্রত_মজুমদার
অবশেষে একলব্য মন্ডল গৃহত্যাগ করল । স্ত্রী পুত্র কন্যা সবাইকে হতবাক করে দিয়ে, পাড়াপড়শিদের কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলে দিয়ে বাণপ্রস্থে গেল সে ।
যাবার সময় একজোড়া প্যান্ট, খানতিনেক জামা আর কিছু রাহাখরচ সঙ্গে নিল । সকালে উঠেই একলব্যের খোঁজ পড়ল, ঘর বাহির পুকুর ঘাট চায়ের দোকান ইত্যাদি খুঁজেও যখন তাকে পাওয়া গেল না তখন স্বামীর তোরঙ্গটা খুলল বিমলা।
না, টাকাগুলো নেই। গৃহপ্রকল্পে আসা হাজার চল্লিশেক টাকা নিয়ে ভেগেছে মুখপোড়া। হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল বিমলা, “ওগো আমার কি সর্বনাশ হলো গো…… কোন হতচ্ছাড়ির সাথে দেশছাড়া হল গো……”
কান্নাকাটি শুনে জড়ো হলো সবাই, যে যেখানে ছিল কেউ বাদ গেল না। এমন দিন তো আর বারবার আসে না বাপু। যে হলধর মাষ্টার একলব্যের মতো চাষাকে পাত্তা দিত না সেও এসে হাজির হলো। হাজার হোক ছেলেবেলার বন্ধু বলে কথা।
বাইক থামিয়ে বিমলার কাছে এসে বলল,”লবটা বরাবরেরই ওরকম। আপনি কাঁদবেন না বৌদি, ছেলেমেয়েগুলোকে তো দেখতে হবে শক্ত হোন।”
ওপাড়ার জয়ন্ত সাঁপুই বলল, “অনেক ক্ষতি করে দিয়ে গেল গো, গতবর্ষার সার বাবদ হাজার পাঁচেক টাকা পাই। ওর বড় ছেলেকে চাইতে ভয় করে, যা ছেলে টাকা চাইলে মেরে রেখে দেবে একেবারে ।”
জয়ন্ত সাঁপুইয়ের কথা মিথ্যা নয়, একলব্যের ছেলে প্রদীপ বড়ই রগচটা, আলো যা দেয় তা দেয় লোকের চালে আগুন লাগিয়ে দিতে দু’বার ভাবে না। বাপের গৃহত্যাগের খবর পেয়ে জিওলতলার আড্ডা ছেড়ে ঘরে এল প্রদীপ। লুঙ্গিখানা দু’ভাঁজ করে বাঁধতে বাঁধতে বলল,”কি হল রে মা ? শালো পালিয়েছে ? জানতাম আমি। তু একবারে কাঁদবি না, আমি গোটা গাঁয়ে খবর লিছি দেখছি কার বৌ পালিয়েছে।”
বাবার প্রতি ছেলের এমন সম্মান কলিযুগে বিরল নয়। বাপের যা হল তা হল, এখন গাঁয়ের কোন বৌ-ঝি পালিয়েছে তার সমীক্ষা চলবে। এইকাজে একা প্রদীপ নয়, গাঁয়ের শিক্ষিত লোকেরা সামিল হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা নামক জিনিসটি ঠুঁটো জগন্নাথ, সেটা থাকলেও যা না থাকলেও তাই। গোটা গাঁ লেগে পড়ল একলব্যের বুড়ো আঙুল থুরি কানকাটার কাজে।
একমাত্র ব্যতিক্রম একলব্যের দিদি মিনতি । তার বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামেই। একলব্যের গৃহত্যাগের খবর পেয়েই সে তেত্রিশকোটি দেবদেবীকে ডাকতে লাগল যেন তার ভাই যেখানে যায় একাই যায়। অবশ্য একলব্যের জামাই বাবু কুঞ্জলালের মত আলাদা, সে তার স্ত্রীকে বলল, “ভাইয়ের জন্য কেঁদে কি হবে, ও ভালোই আছে। রণচণ্ডী বৌয়ের হাত হতে পালিয়ে বেঁচেছে। শান্তির আশ্রয় পেয়েছে।”
-“মানে ? কি বলতে চাও তুমি ?” মিনতি জিজ্ঞাসা করল।
কুঞ্জলাল ফিক করে হেসে বলল, “তোমাদের গাঁয়ের সুদন ঘোষের বৌ শান্তিকে কাল রাত হতেই পাওয়া যাচ্ছে না। গরুখোঁজা খুঁজেছে সবাই। সন্দেহ……. ”
আর কিছু বলল না কুঞ্জলাল, সন্দেহটা যে কি তা বুঝতে বাকি রইল না মিনতির। সে তখন চোখের জলে ঈশ্বরের কাছে একটাই মিনতি জানাল, “হে ভগবান, সুদন ঘোষের বৌ যে জাহান্নামেই যাক যেন ভাইয়ের সঙ্গে না যায়। আর গেলেও যেন লোক জানাজানি হওয়ার আগেই ফিরে আসে। হে দয়াময়, তুমিই ভরসা।”
সুদন ঘোষ বলল, “তৃতীয় পক্ষের ঝামেলা না করলেই হতো। আর লবটাই বা কেমন ছেলে, বলি তোর ঘরে অত বড় বড় ছেলেমেয়ে আর তু কিনা…… ” কান্নায় রুদ্ধ হয়ে এল গলা।
জয়ন্ত সাঁপুই বন্ধুবান্ধবের কাছে আক্ষেপ করে বলল,”আমার দোকানে ওঠাবসা করত, একটিবারের জন্যও ঘূণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি যে সুদনের বৌকে নিয়ে পালিয়ে যাবে। ওহে সুদন, রাতে বিরেতে যদি আসে তো আমার টাকার কথাটা বলো একবার। ”
সুদন ঘোষ রেগে গিয়ে সামনে রাখা ফলিডলের শিশিখানা ছুড়ে মারে সাঁপুইকে। উপস্থিত বাকিরা হো-হো শব্দে হেসে ওঠে।
মাসখানেক পর ফিরে এল একলব্য। পুরোপুরি সাধুর বেশ। একলব্যের পায়ে আছড়ে পড়ল বিমলা,” সে হতচ্ছাড়ি কই গো….. ”
একলব্য তার পা হতে একপাটি খড়ম খুলে বাগিয়ে ধরে বলল, “আমিও খুঁজছি। সেই হতচ্ছাড়ি শান্তিকে আর যে বা যারা রটিয়েছে যে আমি ওর সাথে পালিয়েছি তাদেরকে।”
সেদিন হতেই একলব্য মন্ডল ওরফে স্বামী একলব্য গাঁয়ের শেষে আশ্রম করে বসবাস করতে শুরু করলেন। উদ্দেশ্য ক্লিনচিট। কিন্তু দেবে কে ? শান্তি যতক্ষণ এসে না বলছে যে একলব্যের সঙ্গে সে যায়নি ততক্ষণ ক্লিনচিট হচ্ছে না। আর ক্লিনচিট না পাওয়া পর্যন্ত এ গাঁয়ের লোকেদের ছাড়বে না সে।
সংসারে ঢোকে না একলব্য,তার রণচণ্ডী বৌ সুবোধ বালিকার মতো স্বামীর আদেশ শিরোধার্য করে চলেছে। ভয় ভয়ে চলে বিমলা, পাছে কোনও ভুলচুক করে বসে আর তার স্বামী শান্তিকে নিয়ে এসে সাধনভজন শুরু করে। তিনবেলা ভালোমন্দ রান্নাকরে দিয়ে আসে একলব্যকে । পান হতে চুন খসতে দেয় না।
এদিকে ছেলেও বাপকে আর ‘তু’ বলে না, আপনি আজ্ঞে করে চলে। গৃহপ্রকল্পের টাকার হিসেবও তামাদি হয়ে গিয়েছে। উপরন্তু গাঁয়ের লোকজনই দর্শনে আসে আর টাকাটা সিকিটা দেয়।
ইচ্ছা থাকলেও জয়ন্ত সাঁপুই টাকা চাইতে আসে না, বরং কলাটা মুলোটা আশ্রমে দিয়ে যায়। বর্ষা থামলেই আশ্রমের একটা ঘর তৈরি করে দেবে সে। কেউ কিছু বললে বলে, “সব বাবার লীলা। জয় একলব্য বাবা কি….”
সবচেয়ে করুন অবস্থা সুদন ঘোষের, ওর বৌ শান্তি গাঁয়ে ফিরতে চাইলেও একলব্যের ভয়ে পারে না। সুদন নিজেই নিজেকে গালাগালি দিয়ে বলে, “কি মত্তে যে লবটাকে জড়িয়ে ফেললাম !”
একলব্য আর ক্লিনচিট পাবে বলেও মনে হয় না, কারন শান্তির ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটেছে সবাই। শান্তিও ভয়ে এমুখো হয় না, কি মরতে যে জামাইবাবুর পিসতুতো ভাইয়ের সঙ্গে তাজমহল দেখতে গিয়েছিল সেটা ভেবেই কেঁপে ওঠে সে।
একদিন দুপুরবেলা সজনের ডাঁটা চিবোতে চিবোতে একলব্য বলল, “আর যাই বলো গিন্নি তোমার রাঁধার হাত যেন খুলেছে। সন্ন্যাসী হয়ে আর কাজ নেই। ও হ্যাঁ, কালকে একটু দেশি বড়ি দিয়ে পোস্ত বানিয়ে এনো তো।”
বিমলা আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলল, “যা বলবে তাই রেঁধে দেব। স্বামী সেবার মতো পুন্যি আছে ? তবে ওই শান্….”
আর কথা বাড়াল না বিমলা এঁটোকাঁটা ঘুচিয়ে চলল ঘরের দিকে। সূর্যের আলো নাকছাবির পড়ে জ্বলজ্বল করছে। সন্ন্যাসী হতে যাওয়া স্বামীর প্রথম জীবনের উপহার।
#WestBengal

0 Comments