নির্জলা উপবাস




নির্জলা-উপবাস-(সত্য গল্প)

প্রকাশ চন্দ্র রায়

-কি রে সুন্দরী,অত শুকনা লাগছে কেন? কী খেয়েছ আজ?
-খাইনি দাদাবাবু,আজকে উপবাসে আছি। আর কিছু না বলে শুস্কমুখে চলে গেল সে আমার সম্মুখ থেকে।
কেন উপবাসে কেন তারা! মীনাক্ষীর কথা শুনে আঁতকে উঠলাম! হায় রে করোনা! কতজন যে না খেয়ে কাল কাটাচ্ছে লকডাউনে থেকে! ব্যবসা-বানিজ্য সব বন্ধ,শ্রমিক-মজুর আর নিম্নবিত্তরা প্রায় না খেয়ে, হাঁ-হুতাশে দিন কাটাচ্ছে।
নিজের উপরও ক্ষোভ জন্মালো খুব, প্রায় প্রতিদিনই তো ওদের খোঁজ-খবর করি,আজকে এতবেলা হলো,কেন একটু খবর করতে পারিনি! ইস্! ওদের মেয়ে দুটোও নিশ্চয় না খেয়েই আছে! তাড়াতাড়ি স্নান সেরে খেতে বসে ডেকে পাঠালাম মীনাক্ষীর মেয়ে দু'টো'কে। ওর বড়মেয়ে মিনু, স্থানীয় বিএম কলেছে পড়ে আর ছোটমেয়ে চিনু আমার স্ত্রীর কিণ্ডারগার্ডেন স্কুলে বিনা-বেতনে ক্লাস থ্রী-তে পড়ে। দু'জন কাছে এলে বললাম,
-মা'মণিরা বসো,আজ আমরা তিনজন মিলে একসঙ্গে লাঞ্চ করবো।
আঁতকে উঠে বলল মিনু!
-না,না, মেসোমশাই,আমরা তো উপবাসে আছি।
-উপবাসে যে আছো তা আমিও জানি,শুনেছি তোমার মায়ের কাছে। নাও আর ন্যাকামি করতে হবে না,বসে পড়ো।
প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বললাম ওদেরকে।
তবুও বসছে না ওরা, কালো শীর্ণ, পাটকাঠির মত দু'টো কঙ্কাল যেন,ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো ডাইনিং টেবিলের কাছে। তৎমুহুর্তেই প্রায় ছুটে এলো ওদের মা মিনাক্ষী দেবী। একই রকম কালো-শীর্ণ লম্বা চেহারা তারও,অভাবে-অভিযোগে,চিন্তা-ভাবনায় জর্জরিত,শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়ে গেছে। লক্ষ্য করে দেখলাম সদ্যস্নাতার কপালে,নাকে,কণ্ঠে আর বাহুমূলে তপস্বিনীর মত তিলক-চন্দনের ফোঁটা,কানে গোঁজা তুলসীপাতা। কাছে এসেই না-না করে উঠলো,
-না,না, ওদেরকে খাওয়াবেন না দাদাবাবু,আমরা সবাই উপবাসে আছি যে।
-উপবাসে আছো তা তো শুনেছি, তো উপবাস কেন? কিসের জন্য উপবাস ?
উত্তরে মীনাক্ষী যা বলল,তার মর্মার্থ হলো,
আজ শনিবার,শুক্লা একদশী, তাই সূর্য্যোদয় থেকে পরদিন সূর্য্যোদয় পর্যন্ত অষ্টপ্রহর নিরন্ন উপবাস দিতে হয়,ইহাই হিন্দুধর্মীয় রীতি। বিস্ময়াভূত আমি বললাম,
-তা দিদিভাই,অন্ন ভিন্ন আর কী কী খাওয়া যেতে পারে?
খুবই দৃঢ়কণ্ঠে বলল সে,
-খাদ্য তো দূরের কথা,একফোঁটা জলও পান করা যাবে না আজকে। এটাকে বলে নির্জলা একদশী।
দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম,
-আচ্ছা,কাল সকালের মধ্যে যদি তোমাদের বংশের কেউ মারা যায়,তখন কি দশা হবে?
মিনাক্ষী বলল,
-কি আর হবে! যতক্ষণ পর্যন্ত মৃতের সদগতি না হবে,ততক্ষণ পর্যন্ত অভুক্তই থাকতে হবে। এই বলে সে তার মেয়েদেরকে নিয়ে চলে গেল। আমার আর খাওয়া হলো না তেমন,মুরগীর মাংস,ডাল,পাটশাক-ভাজি আর আলু-ভাজির ডিশগুলো,ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো আমার মুখের দিকে। ঘরে এসে ভাবলাম,হায় রে হিন্দুধর্ম! এত কঠোর তোমার নিয়মনীতি!
মিনাক্ষী আমার শালী,দুরসম্পর্কের শালী। ওর শ্বশুরবাড়ী রংপুর শহর থেকে আরও পাঁচ কিলোমিটার দূরে কেরাণীর-হাট নামক গ্রামে। আমাদের উপজেলা শহর থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূর হবে। অভাবে পড়ে এসে আমার বাসার দুটো রুমে বিনাভাড়াতেই থাকে। ওর স্বামীকে একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছি স্থানীয় এক মহাজনের আড়তে। ওর ভাসুর,শ্বশুর-শ্বাশুরী সবাই আছে,ওরাই শুধু বে-কায়দায় পড়ে এখানে থাকতে বাধ্য হয়েছে। সুন্দরী না হলেও সে সম্পর্কে শালী বিধায়,ঠাট্টার ছলে তাকে সুন্দরী বলেই ডাকি আর যথাসম্ভব খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি,ওর মেয়ে দু'টো আমার মেয়েটার খেলার সাথীও বটে।
রাতে বাসায় ফিরে,ওদের কোন খোঁজখবর না নিয়েই ঘুমিয়ে গেলাম,দেশের পরিস্থিতি নিয়েও মাথা ঘামালাম না তেমন,মনটা ভীষণ খারাপ ছিল কেন যেন,জানি না। আজ সকালে মরাকান্না আর হৈ-হট্টগোলের শব্দে ভেঙ্গে গেল ঘুম। ধড়ফড় করে উঠে বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখি,বড়গলায় কাঁদছে মিনাক্ষীর পরিবারের সবাই। পাড়ার লোকজন এসে ভীড় জমিয়েছে সেখানে! ব্যাপার কি? তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গিয়ে শুনি,মিনাক্ষীর ভাসুরের ছেলে অবিনাশ! একটা মাত্র মেয়ের বাবা ,বয়স আর কত হবে বড়জোর ত্রিশ কি বত্রিশ। আজ সকালে মারা গেছে, গতকাল থেকে এ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথায় ভুগছিল সে,আজ সকালে রংপুর মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যায়। ইস্! কি হৃদয়বিদারক সংবাদ! মর্মাহত আমি! লোকজনের জটলা থেকে ডেকে নিলাম গিন্নীকে,আহতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,
-আচ্ছা, ওরা কী খেয়েছে আজ সকালে ?
রুদ্ধকণ্ঠে বলল সে,
-না! কেবলমাত্র রান্না শেষ হয়েছে,আর তাতেই এসেছে এই নিদারুণ দুঃখের খবর!
হা ভগবান! একি কাণ্ডজ্ঞান তোমার! তোমার জন্য চব্বিশঘণ্টা নির্জলা উপবাস দিল যারা,তাদের উপর একি অবিচার! মৃতের সদগতি হতে এখনো তো দশ-বারো ঘণ্টার মামলা! ততক্ষণে এদের উপবাসের সময় দাঁড়াবে গিয়ে পয়ত্রিশ-ছত্রিশ ঘন্টায়।(সমাপ্ত)
০৫/০৪/২০২০ রবিবার।

Post a Comment

0 Comments