অদ্ভুতুড়ে পটলপুরের পটচিত্র - ( পর্ব ১৪ ) সুব্রত মজুমদার

 



-“থাক থাক কাকা, আমি সব জানি।” ঠাকুরকে থামিয়ে দিয়ে বলল জগাই। এরপর গলায় হাত দিয়ে একটা সুর তুলল, সেই সুরের প্রাবল্যে যত রাজ্যের বাদুর ছুটে আসতে লাগল। শুধু জিওলগাছই নয়, আশেপাশে যেখানে যত বাদুর ছিল পড়িমরি করে ছুটে আসতে লাগল।

দেখতে দেখতে জগাই ঢেকে গেল বাদুরের আস্তরণে। বাকি বাদুরগুলো পাগলের মতো ছুটে বেড়াতে লাগল। বাদুরদের পাখার ঝাপটে অজ্ঞান হয়ে গেল মিছরি। পুঁটিরামের তো ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা। ঠাকুরও উল্টে পড়েছেন। সে এক দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। আর হবেই না কেন এই কাজের যে হোতা সেই তো একনম্বর তারকাটা।
বাদুরগুলো গাছ হতে সরে যেতেই কোনোরকমে উঠে দাঁড়ালেন মনোহর ঠাকুর, পুঁটিরামও উঠল। তবে মিছরি এখনও অজ্ঞান। গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে ঠাকুর বললেন, “ওই উপরের ডালটাতে কি একটা বাঁধা রয়েছে যেন, দেখ তো বাবা পুঁটিরাম। সাবধানে উঠবি।”
পুঁটিরাম ঘোড়েল লোক, কোনও কাজেই তার না নেই। তরতর করে গাছে উঠে পড়ল সে। তারপর জিওলগাছের উঁচু ডাল হতে পেড়ে নিয়ে এল একটা আস্ত কঙ্কাল। কঙ্কালের গায়ের ইতস্তত কয়েকটুকরো বিবর্ণ কাপড় আর ধাতব অংশ। সেগুলো দেখেই অনুমান হয় লোকটা ইউরোপীয় কোনও জলদস্যু ছিল। কোমরে ধাতব চেন দিয়ে বাঁধা একটা বিশাল চাবি।
-“লোকটা বোম্বেটে ছিল রে।” চাবিটা কোমরের চেন হতে ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন ঠাকুর। ঠাকুরের চোখমুখে একটা বেদনাক্লিষ্ট ভাব।
-“এখানে বোম্বেটে কিকরে এল ঠাকুর ? বোম্বেটে তো শুনেছি সমুদ্রে সমুদ্রে বেড়ায়। সমুদ্র তো এখান হতে অনেক দূর সেই গঙ্গাসাগর।”
পুঁটিরামের কথা শুনে কি একটা ভাবতে লাগলেন ঠাকুর। অনেকক্ষণ পর বললেন, “তোর কথায় দম আছে রে। কিন্তু লোকটা যে বোম্বেটে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। চল এবার চাবির তালা খুঁজি। ”
এই বলে উঠে পড়লেন ঠাকুর, কয়েকপা এগিয়েই আবার ফিরে এলেন কঙ্কালটার কাছে। হাতের তাগা মতো কি যেন একটা। হ্যাঁ তাইতো। তবে সোনার নয়, তামার। সোনার হলে কবেই চলে যেত পুঁটিরামের ঝোলার ভেতরে।
বাদুরগুলো আবার নিজের নিজের জায়গায় ফিরতে শুরু করেছে। জগাইয়ের সেই সুর আর নেই। ঘুমিয়ে পড়েছে ও।
-“এটাও মরে গেল নাকি গো ঠাকুর ? দু’দুটো মরা নিয়ে এখন কি করি বল তো ?”
পুঁটিরামের কথায় হাসতে লাগলেন ঠাকুর। বললেন, “কিছুই করতে হবে না। মিছরির নার্ভ দূর্বল বলে জ্ঞান ফেরেনি। আর জগাই পড়ে আছে ঢং করে। মিছরিকে তুলে নিয়ে আয়, জগাই আপনাআপনি উঠবে।”
ঠাকুরের কথাই সত্যি, কোনোরকমে জ্ঞান ফেরানো হল মিছরির, তিনজনের ফেরার পথ ধরতেই জগাই উঠে বসেছে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সঙ্গ নিয়েছে।
ফেরার পথেই প্রফেসরের ঘর। উনার ল্যাবরেটরিতে এখনও আলো জ্বলছে, তার মানে প্রফেসর এখনও জেগে আছেন। কিন্তু বাগানের পেছনে ওই ছায়ামূর্তিগুলো কারা ? চোর না ভুত ?
চারজনেই একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে লুকোল। এখান হতেই গোটাটা নজর হয়। চোর না ভুত তার মিমাংসা করেই ছাড়বেন ঠাকুর। বেশ চাপা গলায় ঠাকুর বললেন, “ওরা কি বলছে ভালোকরে শোন তো বাবা পুঁটিরাম।”
পুঁটিরাম সম্মতিসূচক মাথা নাড়তেই জগাই বলল, “আর আমি কাকা..?”
-“তোমাকে কি মানা করেছি বাবা জগাই ? মানা করলেও কি তুমি শুনবে ?”
ঠাকুরের কথায় বেশ প্রসন্ন হয়ে কানে হাত লাগিয়ে ছায়ামূর্তিদের কথাবার্তা শুনতে লাগল জগাই। এতই তন্ময় হয়ে শোনে যে ওর কনুইয়ের গুঁতোয় বাকিদের দফারফা হবার জোগাড়। ঠাকুর তো পেটে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। পুঁটিরাম বারবার সরে সরে দাঁড়াতে লাগল। একমাত্র টিকে আছে মিছরি, ওর কোনও ভাবান্তর নেই।
ছায়ামূর্তিগুলো কি যেন লাবড়া নিয়ে গল্প করছে। প্রফেসরের ল্যাবরেটরিতেই নাকি আছে সেটা। আর সেখান পেলেই বিদেশের বাজারে প্রচুর দাম পাওয়া যাবে। ওদের একজন বলল, “সবকিছুর মাঝে এসে পড়ছে ওই মনোহর ঠাকুর, ওর ব্যবস্থা করতে হবে। কি বলিস রে পি-ছয় ?”
ছায়ামূর্তিটার কথায় বেশ গর্ববোধ করলেন ঠাকুর, ফিসফিসে গলায় বললেন, “দেখলেই তো, আমার এই ব্রেনের কত কদর ? ভুতেরাও বলছে।”
ঠাকুরের গর্বের ফানুস ফাটতে দেরি হল না। পি-ছয় বলল, “হ্যাঁ, ব্যাটা জানে না কিছুই আর সব ব্যাপারে মাথা গলাতে যায়। বুঝলি এন-নয়, লোকটার মাথায় টাল আছে।”
এ অপমান আর নিজের কানে শোনা যায় না, আঙুল দিয়ে কান বন্ধ করলেন। বললেন,”সব ব্যাটারা পাজী। কালকেই যথানামে পিন্ডি দিয়ে মুক্ত করে দেব ব্যাটাদের।”
জগাই বেশ খুশি মনেই চপ করে ধরল ঠাকুরকে, কাঁদকাঁদ গলায় বলল,”কাকা গো, তুমি আমার সোনা কাকা, আমার নামেও একটা পিন্ডি দিও। যা খরচা লাগে আমি দেব। ও চিন্তা তুমি কর না।”
ঠাকুর খাপ্পা হয়ে বললেন,”তোকে পিন্ডি দেব কেন, তুই কি মরেছিস ?”
জগাই নির্বিকার ভাবে বলল,”কারোর দরকার মরার পরে তো কারোর দরকার মরার আগে, – যার যেমন দরকার কাকা। পিন্ডির তিল সেদ্ধচাল আল ফলের মাখাটা কিন্তু খেতে দারুণ।”
-“এই তুই খেয়েছিস নাকি ?”
জগাই অম্লান বদনে বলল, “কতবার।”
ভয়ে আর কিছু বলার ক্ষমতা হয়নি ঠাকুরের। জগাই যে সামান্য কিছু নয় সে সন্দেহ বহুদিন ধরেই ছিল, কিন্তু ও যে পিন্ডিখেকো তা জানা ছিল না। সবকিছু শোনার পর পুঁটিরামও দু’কানে হাত দিয়ে রাম নাম জপে নিল।
এসব ভৌতিক আলোচনা যখন হচ্ছে ঠিক তখনই ছায়ামূর্তিগুলোর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আরেক ছায়ামূর্তি। বাকি ছায়ামূর্তিগুলোকে দেখে থমকে দাঁড়াল সে। তারপর ঢুকে পড়ল একটা ঝোপের ভেতর।
-“এ.. এ… কে রে জগাই ?” ঠাকুরের গলা কেঁপে ওঠে।
জগাই বলে, “আরেকরকম ভুত গো কাকা। যেমন আমের হয়, হিমসাগর, রাণী, ল্যাংড়া, এদেরও তেমনি । হরেক কিসিমের ভুত গো।”
ঠাকুর আর ভুতেরা যখন যে যার চর্চায় ব্যস্ত ঠিক তখনই হাজির হয়েছে আরেকদল গোয়েন্দা । এরা শুঁকে শুঁকে এসেছেন এদিকে ।
একটু জোরে শুঁকে নিয়ে ভেউভেউ বলল, “ঠিক জায়গাতেই এসেছি রে। বেশ খোশবাই আসছে। পরোটা আর মাটনকষা।”
একবার খ্যাঁ করে আওয়াজ তুলে খ্রিংখাক বলল,”প্রফেসরের ঘর হতে বোধহয়।”
খাবারের গন্ধে খ্যাকখ্যাক বুড়োর জিভ হতে জল টসকে পড়ল । একটু লজ্জিত হয়ে বলল, “খুব খিদে পেয়েছে রে। চল আক্রমণ করি।”
ভেউভেউ রেগে গিয়ে বলল,”তোমার শুধু খিদে আর খিদে। দাঁড়াও দেখি খাবারগুলো কোথায় কিভাবে আছে। মেপেজুপে না এগোলে শেষমেশ মারখেয়ে মরতে হবে। আমার মনে হয় প্রফেসরের ঘরে নয়, খাবার আছে ওই লোকগুলোর কাছে।”
অনেক আলাপ আলোচনার পর কুকুরের দল ঝাঁপিয়ে পড়ল ছায়ামূর্তিগুলোর উপর। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল কামড়াকামড়ি আঁচড়াআঁচড়ি চিৎকার । ছায়ামূর্তিগুলোর সঙ্গে থাকা খাবারের প্যাকেটগুলো নিয়ে কেটে পড়ল কুকুরের দল।
আর ছায়ামূর্তিরা ? ওরাও বাবার মা-রে করে জুড়ল প্রেতের নৃত্য। নৃত্য দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলেন ঠাকুর। পুঁটিরামের অবস্থাও তাই। একমাত্র মিছরিই দাঁড়িয়ে রইল নির্বিকার ভাবে। জগাই ওর দিকে চেয়ে বলল, “তুমিই বা কেন…. অজ্ঞান হয়ে যাও।”
জগাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল পুঁটিরাম আর মনোহর ঠাকুরের জ্ঞান ফেরানোর কাজে। এদিকে হৈচৈ শুনে দরজা খুলে বাইরে এসেছেন প্রফেসর। হাতে তার একটা পাঁচসেল টর্চ।
চলবে….

Post a Comment

0 Comments