প্রকাশ চন্দ্র রায়
★আজ ২৪শে মে ২০২১ সোমবার। আকাশ এর মুখেই শুনলাম ২৮ তারিখ পর্যন্ত তাপমাত্রা নাকি ৩৫° ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে ৩৯° ডিগ্রীর উপরে থাকবে। চমকে উঠলাম ওর কথা শুনে,
-কেন রে বাবু?
-সূর্য নাকি এ কয়দিন সরাসরি কর্কটক্রান্তি রেখার উপরে অবস্থান করবে।
-তাহলে তো ভীষণ গরম পড়বে দেখছি!
-হ্যাঁ বড়'বা,গতকাল থেকে ৩৩° ডিগ্রী চলছে।
-তাতেই তো অতিষ্ঠ হয়ে গেছি গরমে! আরও ২°-৪° বেশী হলে কী দশা হবে বলো তো।
আকাশ আমার ছোট ভাইয়ের ছেলে, বেশ মেধাবী। প্রতিদিন শহরে এসে দিনেরাতে বেশ কয়েকটা টিউশনি করায় আর ফাঁকা সময় যেটুকু বাঁচে আমার চেম্বারে আড্ডা মারে। লাঞ্চ টাইমের পরে দুই-আড়াইটা নাগাত চেম্বারে এসে বলল,
- চলুন বড়'বা কফিসপ এ গিয়ে কফি খেয়ে আসি।
-ওরে বাব্বা! ফুটন্ত এ গরমে চলন্ত ফ্যানের নীচ থেকে এক পা'ও নড়তে পারবো না বাপু। তুমি একাই যাও, আমি ততক্ষণে ফ্যানের নীচে বসে একটা কবিতা লিখি।
-চলুন না বড়'বা,কফিসপেও তো ফ্যান ঘুরছে!
ওর জেদ রক্ষা করতে চেম্বার থেকে বেরুবো কি না ভাবছি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! হুট করে বিদ্যুৎ চলে গেল আর আমার মাথার উপরের ঘূর্ণায়মান সিলিং ফ্যানটা খুব দুর্বলভাবে কয়েকটা পাক ঘুরে শেষে একদম স্তিমিত হয়ে গেল।
ঘটনার আকস্মিকতায় আকাশ'টা আনন্দ পেল খুব। হাসতে হাসতে কাছে এসে বলল,
- এবার কী করবেন বড়'বা? আমার প্রস্তাবে রাজী হয়ে যান,চলুন যাই কফিসপে।
আমার মাথায় তখন কবিতার ছন্দ'রা আনাগোনা করছে। যাহোক ওর জেদ রক্ষা করতে রাজী হয়ে বললাম,
-ফ্যানের সুইচটা অফ করে দাও তাহলে,তারপর চলো। মেইনরোড পেরিয়ে পৌঁছলাম কফিসপে,ভিতরে না ঢুকে বারান্দায় বসেই দু'টো কপির অর্ডার করলো স্নেহাষ্পদ আকাশ। কফির স্বাদ ক্যামন লাগলো তা আর বোধগম্য হলো না আমার,কারন আমি তখন মনে মনে অনাগত কবিতার ছন্দ-মাত্রার হিসেব কষছি। কফিপান শেষে আকাশকে ছেড়ে তড়িঘড়ি করে চেম্বারে এসে মনযোগী হলাম লেখায়। লিখছি আর ভাবছি! ভাবছি আর লিখছি! লেখার তালে তালে ঘামছিও দরদর করে। ঘণ্টাখানেকের কাছাকাছি মত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে! কবিতার উপসংহার টানতে পারছিই না! হঠাৎ কবিপত্নীর আগমন ঘটে গেছে চেম্বারে,আমি তা টেরই পাইনি। কবিপত্নী-আমার ওয়াইফ। ওকে কেউ কবিপত্নী আর কেউ কেউ মাস্টারনি খেতাবে ডাকে, আমি ডাকি কবিপ্রিয়া বলে। চেম্বারে এসেই তর্জন-গর্জন শুরু করে দিল সে!
-কী ব্যাপার কবি! লাঞ্চ সারতে বাসায় আসোনি কেন? নিশ্চয় কবিতা লেখা নিয়ে মত্ত ছিলে তাই না!
সত্যিটা ধরা পড়ায় আমি কাচুমাচু ভাব করে কিছু বলার মুহূর্তেই আবার গর্জে উঠলে সে,
-কী ব্যাপার! তুমি এতবেশী ঘামছো কেন?
এ কথা বলেই সে তার শাড়ীর আঁচল দিয়ে,আমার মুখ,গলা,ঘাড় মুছিয়ে দিতে লাগলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি ভাবছি-কবিতা লেখা গোল্লায় গেল এবার!
এমন সময় আকাশ এসে আমাদের দাম্পত্যসুখের দৃশ্যটা উপভোগ করতে করতে ঘাড়,গলা,মুখ মুছিয়ে দেয়ার কারণটাও উদঘাটন করে ফেললো। বিস্মিতকণ্ঠে বললো,
-ব্যাপার কী বড়'বা! ফ্যানটা ছাড়েননি কেন? একঘণ্টা আগেই তো কারেণ্ট চলে এসেছে!
আমি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখি-বিদ্যুৎমিটারের সিগন্যাল লাইটের সবুজ আলোটা কী সুন্দরভাবে মিটিমিটি করে জ্বলছে আর সিলিং ফ্যানের সুইচটা অফ থাকা অবস্থায় নিরবদর্শক সেজে আমাকেই দেখছে! আমার বোকামী বুঝতে পেরে কবিপ্রিয়া অগ্নিমূর্তি ধারন করলো আর স্নেহাস্পদ আকাশ হা-হা করে হাসতে হাসতে সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে অফ করা সুইচটা অন করে দিলো। ★২৪,০৫,২০২১ সোমবার-চেম্বার।

0 Comments